জেতা ম্যাচ হারলো বাংলাদেশ

ক্রিকেটকে বলা হয় সর্বময় অনিশ্চয়তার খেলা। কিন্তু এই অনিশ্চয়তা মাঝে মধ্যে এমন বিচিত্র রূপ দেখায় যা দেখার জন্য হয়তো কেউ সহজে প্রস্তুত থাকে না। কিন্তু ঐ যে খেলাটাই যে অনিশ্চিয়তায় ভরপুর। কখন যে কি রূপ দেখায় তা তো বলা মুশকিল। তবে এই বিচিত্র রূপ দেখতে যেন অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে এই বিচিত্রতাও মাঝে মধ্যে বিষিন্নতায় রূপ নিয়ে থাকে। এই যেমন আজ ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের হার যেন অনিশ্চয়তার খেলার বিষন্নতার দিকটি মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে ১-০ তবে এগিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৩ উইকেটের জয়। দেখে মনে হতে পারে এক কষ্টার্জিত জয় কিংবা এক বীরত্বের জয়। কিন্তু আদৌতে এটাকে বলা যায় বাংলাদেশের কাছ থেকে খাবার ছিনিয়ে নেয়ার মতো। মানে হচ্ছে জয়টা বাংলাদেশের হাতের মুঠো থেকে একেবারে কেড়ে নিয়েছে। কেননা প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিন শেষেও যখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জয় প্রায় নিশ্চিত কিন্তু পঞ্চম দিনে বাংলাদেশকে তোয়াক্কাই করলো না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমন জয় যেন বাংলাদেশের গালে চপেটাঘাতের সমান। কেননা বাংলাদেশ নিশ্চিত জয়ের পথে এগোচ্ছিলো‌। কিন্তু হঠাৎ যেন এক অদৃশ্য ঝড়ে উড়ে গেল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জয়ের সম্ভাবনা। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক কাইল মেয়ার্সের কাছেই হেরে গিয়েছে বাংলাদেশ তা বলাই বাহুল্য। 


দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্টে ৩রা ফেব্রুয়ারি মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম দিনের শুরুতে টসে জয়লাভ করে বাংলাদেশ। টস জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেহাত মন্দ ছিলো না। কারণ চট্টগ্রামের পিচ অনুযায়ী প্রথমে ব্যাট করলে সুবিধা বেশি পাওয়া যায়। কারণ চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করা আর পাহাড় জয় করা যেন সমান হয়ে যায়। এটা হলফ করেই বলা যায় যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল যদি টস জিততো তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল অবশ্যই ব্যাটিং ছাড়া বোলিং নিতো না। কেননা পিচের ইশারা অনুযায়ী প্রথমে ব্যাট করাই ছিলো উত্তর নয়। তবে কে জানতো এই সিদ্ধান্ত ভারী পড়বে। 
যাইহোক, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একাদশে ছিলেন: তামিম ইকবাল, সাদমান ইসলাম অনিক, নাজমুল হোসেন শান্ত, মমিনুল হক সৌরভ ( অধিনায়ক ), মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান লিটন কুমার দাস ( উইকেট রক্ষক ), মেহেদী হাসান মিরাজ, নাইম হাসান, তাইজুল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান। দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন ইয়াসির আলি রাব্বি।


ওয়েষ্ট ইন্ডিজের একাদশে যারা ছিলেন: ক্রেইগ ব্রাথোয়েট (অধিনায়ক), জন ক্যাম্পবেল, জার্মেইন ব্লাকউড, শেন মসেলি, ক্রোমা বোন্নার, জসুয়া ডি সিলভা ( উইকেট রক্ষক ), কাইল মেয়ার্স, রাহকিম কর্ণওয়াল, জোমেল ওয়ারিকান, কেমার রোচ, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল।
খেলায় আম্পায়ার হিসেবে ছিলেন রিচার্ড উইলিংওর্থ এবং শরফউদ্দৌল্লাহ ইবনে সৈকত। এছাড়া তৃতীয় আম্পায়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজী সোহেল এবং ম্যাচ রেফারি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিয়ামুর রশিদ। 


প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৪৩০ রান করে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মোট ১৫০.২ ওভার ব্যাটিং করে। অতিরিক্ত খাত থেকে এসেছে ১৯ রান। বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ইনিংসে যে যত রান করেছেন: সাদমান ইসলাম অনিক- ৫৯ রান, তামিম ইকবাল খান- ৯ রান, নাজমুল হোসেন শান্ত- ২৫ রান, মমিনুল হক সৌরভ- ২৬ রান, মুশফিকুর রহিম- ৩৮ রান, সাকিব আল হাসান- ৬৮ রান, লিটন কুমার দাস- ৩৮ রান, মেহেদী হাসান মিরাজ- ১০৩ রান, তাইজুল ইসলাম- ১৮ রান, নাইম হাসান- ২৪ রান, মুস্তাফিজুর রহমান- ৩ রান।

ওয়েষ্ট ইন্ডিজের হয়ে সর্বোচ্চ ৪টি উইকেট নিয়েছেন ওয়েরিক্কান, ২টি উইকেট নিয়েছেন রাহকিম কর্ণওয়াল, ১টি করে উইকেট নিয়েছেন কেমার রোচ, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল, বোন্নার।
বাংলাদেশের করা ৪৩০ রান নিয়ে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করলেও সুবিধা করতে পারেনি ওয়েষ্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল। কোনোমতে ফলো অন এড়ালেও ইনিংস বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি ওয়েষ্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল। মাত্র ২৫৯ রানে অলআউট হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ১৭১ রানের বিশাল বড় লিড নিতে সমর্থ হয়। 


ওয়েষ্ট ইন্ডিজের হয়ে যে যত রান করলেন: ক্রেইগ ব্রাথোয়েট- ৭৬ রান, জন ক্যাম্পবেল- ৩ রান, শেন মসেলি- ২ রান, বোন্নার- ১৭ রান, মেয়ার্স- ৪০ রান, ব্লাকউড- ৬৮ রান, জসুয়া ডি সিলভা- ৪২ রান, রাহকিম কর্ণওয়াল- ২ রান, কেমার রোচ- ০ রান, ওয়ারিকান- ৪ রান, গ্যাব্রিয়ের-০ রান। 
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে সর্বোচ্চ চারটি উইকেট নিয়েছেন অফ স্পিন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। এছাড়া দুটি করে উইকেট নিয়েছেন- মোস্তাফিজুর রহমান, তাইজুল ইসলাম ও নাইম হাসান। 
তবে এত বড় লিড পেলেও তা যেন বাংলাদেশের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনেনি বরং দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছিলো। কেননা প্রথম ইনিংসে ৪০০ এর বেশি করা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল দ্বিতীয় ইনিংসে যেন চুপসে গিয়েছিলো। ২০০ রান তুলতেই যেন বেশ কষ্ট করতে হচ্ছিলো বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে। শেষ অবধি ৮ উইকেটের বিনিময়ে ২২৩ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দলকে ৩৯৫ রানের বিশাল জয়ের লক্ষ্য ছুঁয়ে দেয়। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশের মাটিতে এর আগে কেউ পেরোতে পারেনি‌। তাই ভাবা হচ্ছিলো যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল খুব সহজেই জয় তুলে নিবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পিচ চতুর্থ দিন শেষে যেন বিপরীত আচরণ করছিলো। তাই ধরা হচ্ছিলো ভিন্ন কিছু হতেই পারে।
কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩ উইকেট হাতে রেখে এত বড় লক্ষ্য খুব সহজেই তাড়া করে ফেলে। দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে অর্ধেক রান একাই করে নিয়েছিলো অভিষিক্ত কাইল মেয়ার্স। তিনি একাই ২০১ রান করেছিলেন, এছাড়া বোন্নার করেছেন- ৮৬ রান, ব্রাথোয়েট- ২০ রান, জন ক্যাম্পবেল- ২৩ রান, শেন মসেলি- ১২ রান, ব্লাকউড- ৯ রান, জসুয়া ডি সিলভা- ২০ রান, কেমার রোচ- ০ রান। 


প্রথম ইনিংসের ন্যায় দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে সর্বোচ্চ চারটি উইকেট নিয়েছেন অফ স্পিনার অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। এছাড়া দুটি উইকেট নিয়েছেন তাইজুল ইসলাম এবং একটি উইকেট নাইম হাসান। 
ম্যাচসেরা হয়েছেন কাইল মেয়ার্স। তবে প্রথম ইনিংসে এত বড় লিড নিয়েও জয় নিতে না পারাটা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য লজ্জাজনক। তবে এ লজ্জার ভাগীদার অবশ্যই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনারদের। কেননা বাংলাদেশের স্পিনাররা কোনো সুবিধা করতেই পারেননি। এছাড়া রয়েছে ফিল্ডারদের ক্যাচ মিসের মহড়া। তবে অনেক ভক্তরা অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতেহ সাকিব আল হাসানের না থাকাটাই হয়েছে কালের। সাকিব থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারতো। তবে এ বিষয়ে যে যাই বলুক সাকিব বিহীন আজ অনায়াসেই জিতে যেতে পারতো। এখানে মূলত যে ভুলটা করেছে তা হলো ক্যাচ মিস করা। এছাড়া একটা প্রাইম টাইমে একটা সহজ রান আউট যা কিনা নাইম ধরলে রান আউট নিশ্চিত হতে পারতো। আর খেলার মোড় সহজেই ঘুরে যেতে পারতো।


তবে ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মমিনুল হক সৌরভ বলেছেন প্রথম টেস্টের ভুল থেকে তিনি শুধরে নিয়ে দ্বিতীয় টেস্ট জিততে চান। দ্বিতীয় টেস্ট জিততে পারলে অন্ততপক্ষে সিরিজ ড্র করতে পারবে। আর নাহয় নিজেদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা বরণ করতে হবে। অবশ্যই বাংলাদেশ দল চাইবে না হোয়াইটওয়াশ হতে। তাই দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ সবোর্চ্চ দিয়েই খেলবে তা আশা করাই যায়। 

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.