বঙ্গবন্ধু ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ

বাংলা, বাঙ্গালী ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি এই তিনটি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই তিণের মিশেলে যার জীবন, সংগ্রাম ও রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তিনি হচ্ছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। সংস্কৃতি হচ্ছে আত্মা বা মনের কর্ষণ। বাঙ্গালীর রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। আর এই হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি যার রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তার দীর্ঘ দেহ, বজ্রকণ্ঠ, বক্তব্য দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা শেখ মুজিবুর রহমানকে করে নেতা থেকে মহান নেতায় পরিণত করেছে। এছাড়া তার জনগনকে নেতৃত্বদান করার ক্ষমতা তাকে পরিণত করে মহানায়কে। বাঙ্গালীর রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আদর্শ।

ফরিদপুরের মধুমতি নদীর তীরে একটি ছোট্ট গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। সেই ছোট্ট গ্রামটিতে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ শেখ লুৎফর রহমান ও সায়রা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন কেইবা বুঝতে পেরেছিলো এই ছোট্ট গ্রামের এই ছেলেটিই একদিন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে। টুঙ্গিপাড়াতেই বঙ্গবন্ধু বড় হতে থাকেন। গ্রামের আলো বাতাসের মধ্যেই তার ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা। শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব ও কৈশোরের সময় কাটে টুঙ্গিপাড়ার স্থানীয় এমই স্কুল, গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল, মাদারীপুর হাই স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে। পড়াশোনার বাইরেও আলাদা একটি জগত ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি গান গাইতে ও খেলাধুলা করতে অনেক পছন্দ করতেন। এছাড়া পত্রিকা পড়া তার নিয়মিত কাজের মধ্যে একটি ছিলো। তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান তাদের বাড়িতে দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, আনন্দবাজার পত্রিকা রাখতেন। আর এর ফলে কিশোর মুজিব ছোট বয়স থেকেই এই সব পত্রিকা মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকেন। জানতে শুরু করেন দেশের কথা, জাতির কথা, রাজনীতির কথা, সমাজ ও সংস্কৃতির কথা। আর ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। বাংলাদেশ, বাঙ্গালী মানুষদের মুক্তির জন্য যে মানুষটা সবসময় সংগ্রাম করে গিয়েছেন তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর যার জন্য তিনি সারাটা জীবন জেল খেটেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির সকল আন্দোলনের অগ্রনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫২ সালে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। পৃথিবীতে বাঙ্গালী একমাত্র জাতি যারা কিনা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু এই ভাষা আন্দোলনেও অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি জেল খেটেছিলেন। জেলে বসেও অনশন চালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের পর বাংলাদেশে যে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে তা বেগবান করতে যে রাজনীতিবিদরা অবদান রাখেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেননা বঙ্গবন্ধু ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিরা যেভাবে অত্যাচার শুরু করেছে তাতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কোনো বিকল্প নেই। আর তাই তিনি ১৯৫৫ সালের ২১শে অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘ মুসলিম ‘ শব্দটি প্রত্যাহার করেন। এই বাঙালি চরিত্রের অসাম্প্রতায়িকতা ও দেশপ্রেম দৃঢ়তর হয়েছিল যে মহান ব্যক্তির কারণে তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি প্রস্তাব। লাহোর প্রস্তাবের সাথে মিল রেখে ২৩শে মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। এই ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য ছিলো পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। এই দাবির ভিত্তিতে ফেডারেল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে। এই ছয় দফা দাবি বাঙ্গালীর স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। এই ছয় দফা দাবিকে বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ বলা হয়ে থাকে।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ) দাঁড়িয়ে বাঙ্গালীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। আর তার ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙ্গালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এক মুহুর্ত কার্পণ্য করেনি। তিনি বলেছিলেন, ” যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।” মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আর তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেননা বাঙালি সেসময় পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আমাদের শক্তির প্রধান উৎস। তার নামটিই যে ছিল আমাদের ভরসা, আস্থা, শক্তি, সাহস ও প্রেরণার উৎস।

বাঙ্গালি ও বাংলাদেশের মানুষকে কতটা ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তা অনুধাবন করা যায় বঙ্গবন্ধু্র স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিনে অর্থ্যাৎ, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন তাতে। ঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেন আমার পেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলো। আমি ঠিক করেছিলাম আমি তাদের নিকট নতি স্বীকার করবো না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা। এই ভাষণ থেকেই অনুধাবন করা যায় দেশের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অকৃত্রিম ভালোবাসা।

১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের উপর সাহিত্য পরিষদ থেকে ৩২টা বই বিছিয়ে বসেন মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা। আর ১৯৭৪ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির যে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন করা হয় তার উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ” সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুখ, শান্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি।”

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট একদল ঘাতক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে। তবে সেই হত্যার আগে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর এসেছিলো যে কেউ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তাকে হত্যা করতে চাইছে। কিন্তু সে সময়ে বঙ্গবন্ধু সেই কথা বিশ্বাস করতে চাননি। তিনি বলেছিলেন যে আমার দেশের মানুষ আমাকে অনেক‌ ভালোবাসে আমার দেশের মানুষ কখনোই আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস যে দেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধু নিজের ও তা পরিবারের থেকে বেশি ভালোবাসতেন সেই দেশেরই একদল ঘাতক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেন। এমনকি ৭ বছর বয়সী ছোট শিশু শেখ রাসেলকে ও হত্যা করে সেই ঘাতকরা। এমনকি এটাও জানা যায় যে বিনা জানাজা ও গোসলে সেই ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে কবর দিতে চেয়েছিলো। এই বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দী করে রেখেছিলো পাকিস্তানিরা কিন্তু পাকিস্তানরা তার গায়ে একটা আচর দেয়ার সাহস করতে পারেনি। কিন্তু দেশের কিছূ বেইমানরা ঠিক এই কাজটা করতে তাদের হাত কাঁপেনি। ১৯৭৫ সালের ১৬ই আগষ্ট যখন প্রচার হয় বঙ্গবন্ধু আর নেই। তখন কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। সেসময় বঙ্গবন্ধুকে একবার শেষ দেখার সুযোগটাও পায়নি কেউ। বঙ্গবন্ধুর এমন মৃত্যু সত্যিই মেনে নেয়ার মতো না। যে মানুষটা দেশ স্বাধীন করার অন্যতম কারিগর সেই মানুষটির সাথে চরম পর্যায়ের বেইমানি করা হয়েছে।

তবে বঙ্গবন্ধু নেই এই কথাটা কখনোই মানা যায় না। বঙ্গবন্ধু সবসময় ছিলেন, আছেন ও সবসময় থাকবেন সকল বাঙ্গালীর অন্তরে। কেননা তিনি না থাকলেও তার আদর্শ তো মরে যায়নি। তার আদর্শ তিনি বাঙালির মধ্যে দিয়ে যেতে পেরেছেন যার ফলে বাঙালি এখনো শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করবেন। এজন্য বলা হয়, যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.