বদলে যাচ্ছে বার্সেলোনা


পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন খেলাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ফুটবল খেলা। আর ফুটবল খেলার সাথে জড়িয়ে রয়েছে অনেক হাজার বছরের ইতিহাস। আর এই হাজার বছরের ইতিহাসে ঐতিহ্যময় একটি দল হচ্ছে স্প্যানিশ জায়ান্ট এফসি বার্সেলোনা। বার্সেলোনার রয়েছে শতবছরের ইতিহাস। এই ক্লাব থেকে বেরিয়েছে শতশত রথী মহারথীরা। এমনকি বর্তমান সময়ের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এই ক্লাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ক্লাব যেমন তাকে করেছে সেরা তেমনি তিনিও এই ক্লাবকে বিগত ১৫ বছরে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। তবে ক্লাবের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিলো না। বর্তমানে ক্লাবটি আর্থিক দূরাবস্থা ও পারফরম্যান্স উভয় দিকেই টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে বার্সেলোনা ধীরে ধীরে এই দূরাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেটিই ইঙ্গিত করছে। 


বিগত বেশ কিছু বছর ধরে পারফরম্যান্স এর দিক দিয়ে টালমাটাল অবস্থায় চলছিলো। ২০১৮ সাল থেকে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। লুইস এনরিকের পর ভালভার্দে বরাবরের মতো লা লীগা ও কোপা দেল রে নিয়মিত জিতলেও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ছিল অধরা। এছাড়া হোম ম্যাচ জিতলেও এওয়ে ম্যাচ ছিলো বরাবরের মতো অধরা। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বারবার ব্যর্থতার জন্য বরখাস্ত হয়েছিলেন কোচ ভালভার্দে। ভালভার্দে বরখাস্ত হবার পর নতুন কোচ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন কিকে সেতিয়েন। তবে বার্সেলোনার ইতিহাসে যদি সবচেয়ে ব্যর্থ ও ঘৃণিত কোচের নাম উঠে আসে তবে সবার আগে যে নামটি উঠে আসবে তা হচ্ছে কিকে সেতিয়েন।


কিকে সেতিয়েন খুব বেশি সময় যে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে থেকেছেন তা কিন্তু না। তবে যে কয়দিন ছিলেন তার সাথে বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক ভালো ছিলো না। আর তার আমলে বেশ অনেকবার সংবাদমাধ্যমে উঠেছিলো যে, কিকে সেতিয়েন ড্রেসিংরুম সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। আর সবচেয়ে বড় বিষয় লিওনেল মেসির সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো না শোনা গিয়েছিল। 


আর বার্সেলোনার ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম বড় পেরেকটাতো এই কিকে সেতিয়েনের আমলেই লেগেছিলো। বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জাও এই কিকে সেতিয়েনের আমলেই লেগেছিলো। যা এখনো লেগে আছে বার্সেলোনার গায়ে। গতবছর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে জার্মান জায়ান্ট এফসি বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ৮-২ গোলে হেরে বার্সেলোনা চূড়ান্ত লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। এই লজ্জা যেন বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জাগুলোর মধ্যে একটি। এই লজ্জা যেন ফুটবলের লজ্জা। তবে এই লজ্জা কবে কাটবে তা কেউ জানে না। তবে এই লজ্জার ফলে বরখাস্ত হয়ে যান কোচ কিকে সেতিয়েন। 


তবে কিকে সেতিয়েনের বরখাস্তের সাথে সাথে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয় বার্সেলোনার ‌ভিতর। এফসি বার্সেলোনার ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি গতবছর হঠাৎ করেই এক ব্যুরোফ্যাক্স দিয়ে নিজের প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনা ছাড়ার কথা জানান। তবে পরবর্তীতে বার্সেলোনার ইতিহাসে জঘন্যতম প্রেসিডেন্ট জোসেফ মারিয়া বার্তামিউ মেসিকে ক্লাব থেকে চলে যাওয়া আটকিয়ে দেয় ফলে মেসি ক্লাব আর ছাড়তে পারেননি। পরবর্তীতে মেসি ক্লাবের প্রতি অনেক অভিযোগ ও সভাপতির উপর অভিযোগ করলেও পরবর্তীতে ক্লাবে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। 


বার্সেলোনার এই দূরাবস্থার পর বরখাস্ত হয়েছিলেন কোচ কিকে সেতিয়েন। কিন্তু কিকে সেতিয়েনের চলে যাবার পর দলে দরকার ছিলো একজন মাস্টারমাইন্ড কোচের। যেকিনা দলের হাল ধরে দলকে বদলে দিবে। তবে কথায় আছে না দুর্দিনে আসল বন্ধু চেনা যায়। বার্সেলোনার এই দূরাবস্থায় আগে বার্সেলোনার ভালো সময় যারা কোচ হতে চেয়েছিলো তাদের অধিকাংশই বার্সেলোনার খারাপ সময়ের সঙ্গী হতে চাচ্ছিলো না। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন একজন যেকিনা বার্সেলোনার ভালো সময়ে কোচ হবার প্রস্তাব পেলেও ইচ্ছে থাকলেও আসেননি। কিন্তু খারাপ সময়ে দলকে ঠিক করতে সাজানো গোছানো নেদারল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল ছেড়ে এসে পড়েছেন বার্সেলোনায়। তিনি আর কেউ নন। তিনি হচ্ছেন বার্সেলোনার ব্লাড, ইয়োহান ক্রুইফ এর শিষ্য। বার্সেলোনার প্রথম উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতার মূল কারিগর নেদারল্যান্ডের রোনাল্ড কোম্যান।


রোনাল্ড কোম্যান এফসি বার্সেলোনায় আসার আগে নেদারল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন। যে নেদারল্যান্ড কয়েক বছর আগেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিলো না এমনকি ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মূল পর্বের টিকেট পায়নি সেই নেদারল্যান্ডকে ইউরোপ জায়ান্টে বানিয়ে দিয়েছেন মাত্র দুই বছরে‌। তার লক্ষ্য ছিলো নেদারল্যান্ডকে ইউরো জেতানো। কিন্তু ইউরো জেতানোর ইচ্ছে থাকলেও বার্সেলোনার দূরাবস্থা দেখে সাজানো গোছানো নেদারল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল ছেড়ে এসে পড়েছেন বার্সেলোনায়। একটু ভেবে দেখুন তো বার্সেলোনার খারাপ সময়ে যখন কেউ আসতে রাজি হচ্ছিলো না তখন কিন্তু এই রোনাল্ড কোম্যান এসেছিলেন আশীর্বাদ হয়ে।


সবচেয়ে বড় কথা বর্তমানে রোনাল্ড কোম্যানের কোচিংয়ে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে এফসি বার্সেলোনা। প্রথমে বলেছিলাম না অন্য কোচদের সময়ে এওয়ে ম্যাচ ছিলো অধরা। কিন্তু এই রোনাল্ড কোম্যানের অধীনে এফসি বার্সেলোনা সর্বশেষ ১২টি এওয়ে ম্যাচের ১১টিতেই জয়লাভ করেছে। যা স্পষ্ট বলে দেয় বার্সেলোনার বদলে যাওয়ার আভাস। এছাড়া প্লেয়ারদের পজিশনের রয়েছে একটি মজার কথা। সেটি হচ্ছে অন্য দলের কোচেরা যখন মুখস্থ একাদশ খেলাচ্ছে তখন রোনাল্ড কোম্যান এমন একটি বার্সেলোনা দল গড়েছেন যেখানে তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়ের বিপরীতে একটি করে রিপ্লেসমেন্ট রেখেছেন। অর্থ্যাৎ কেউই একাদশে পাকাপোক্ত না। খারাপ করলেই পরের ম্যাচে ড্রপ হতে হয়‌। তবে তিনজনের ক্ষেত্রে কথাটি প্রয়োজ্য নয়। সেই তিনজন হচ্ছে: লিওনেল মেসি, ফ্রাঙ্কি ডি ইয়ং, মার্ক আন্দ্রে টার স্টেগান। তারা তিনজন অটো চয়েজ। এছাড়া রোনাল্ড কোম্যান আরেকটি বড় কাজ করতে পেরেছেন সেটা হচ্ছে গ্রিজম্যানের ভেতর থেকে তার সেরা পারফর্মেন্স বের করে আনতে পেরেছেন। কিছুদিন আগেও গ্রিজম্যান পজিশন নিয়ে বিরক্ত ছিলো। এমনকি গ্রিজম্যান নিজেও বলেছিলেন যে তাকে সঠিক পজিশনে খেলাচ্ছিলো না। পরবর্তীতে রোনাল্ড কোম্যান তার পজিশন দেখে তিনিও বলেছিলেন গ্রিজম্যানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। তিনি গ্রিজম্যানকে সুযোগি দিবেন এবং তার সঠিক পজিশনে খেলাবেন। যেই কথা সেই কাজ। রোনাল্ড কোম্যান গ্রিজম্যানকে নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। তাকে তার পজিশনে খেলাতে থাকে এবং তাকে নিয়ে কাজ করে যান। যদিও গ্রিজম্যান অনেক বাচ্চা সুলভ ভুল করতে থাকেন। তবে কোম্যানের লক্ষ্য ছিলো যেভাবেই হোক গ্রিজম্যানের কাছ থেকে তার সেরাটা বের করে নিয়ে আসবে। আর এখন হয়েছে সেটিই। গ্রিজম্যান ধীরে ধীরে ফর্মে ফিরতে শুরু করেছেন। শেষ ১০ ম্যাচে গ্রিজম্যান দেখিয়ে দিয়েছে কেন সে সেরা।


এছাড়া এই মৌসুমে মেসিকে খুব হাসিখুশি দেখা গিয়েছে। যা গত মৌসুমে ছিলো না। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে মেসি এখন খুব ফ্রি রোল পরলে করতে পারছে‌। যা আগের মৌসুমগুলোতে হচ্ছিলো না। 


এখন এতকিছুর পর হয়তো অনেকর ভিতর একটি প্রশ্ন ঠিক আসছে। সেটি হচ্ছে গত মৌসুমে ট্রফিলেস ছিলো বার্সেলোনা। এই মৌসুমেও যদি ট্রফিলেস থাকে তাহলে উন্নতি কিভাবে হবে? হ্যা ট্রফি জয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা আমি স্বীকার করছি‌। তবে ট্রফি জয়ের আগে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে দলে শৃঙ্খলা ও একতাবদ্ধ হওয়া। যে কাজটি এখন বার্সেলোনা এখন খুবই সুন্দরভাবে করতে পেরেছে।


লা লীগার পয়েন্ট টেবিলের দিকে লক্ষ্য করলে একটি বিষয় স্পষ্ট তা হচ্ছে এবার যদি কোনো অঘটন না ঘটে তবে হয়তো অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ হতে যাচ্ছে চ্যাম্পিযন। আর কোপা দেল রে জিনতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আশা না করাই ভালো। তবে যদি এই মৌসুম মোটামুটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় আর আগামী মৌসুমে লিওনেল মেসি বার্সেলোনায় থেকে যায় তাহলে ধরে নিন পরের মৌসুমে এক আগুন দেখতে পারবেন বার্সেলোনার। বার্সেলোনা হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য। 

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.