শেষ কিন্তু শেষ নয়


হ্যা শেষ হয়েও কিছু কিছু শেষ যেন মনে হয় এ যেন শেষটা হলো না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পের এই চরণটি সর্বস্তরেই সমাদৃত। যে জিনিসের শুরু আছে তার একদিন শেষও আছে। শুরু আছে শেষ নেই এমন কিছু হয়তো নেই থাকলেও তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কেননা মানুষের জীবন চক্রেও জন্মিলে মরিতে হয় কোনোভাবেই তাহা পরিবর্তন করা যায় না। এভাবেই সকল ক্ষেত্রে ব্যাপারটি প্রযোজ্য। সেক্ষেত্রে ক্রিকেটেও বিষয়টি সমান বলে গণ্য। কেননা একজন ক্রিকেটার তার ক্যারিয়ার শুরু যেমন করে তেমনি একদিন শেষ করতে হয়। তবে ক্রিকেটারদের এই চক্রটা বড় অদ্ভুত। কারণ কেউবি রয়েছে যারা পুরো ক্যারিয়ার ক্রিকেট খেলে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। নিজেকে নিয়ে গিয়েছে সফলতার শিখড়ে। আর করেছেন ক্রিকেটকে গর্বিত। যাদের জন্য ক্রিকেট গিয়েছে অনেক বড় পর্যায়ে। তবে যারা শুরু করেছেন তাদেরকেও ক্যারিয়ার শেষ করতে হয় তবে তাদের শেষ যেন শেষ নয়। তারা যেন ক্রিকেটে না থাকলেও ক্রিকেটের সাথেই রয়ে গিয়েছেন গাছের শেখরের মতো। গাছের উপরে যেমন পাতা থাকে দৃশ্যমান কিন্তু শিখর না থাকলে যেমন গাছ দাড়াতে পারতো না তেমনি সেই শিকড়ের মতো করে সেই খেলোয়াড়েরা ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছেন। এরকম অনেক খেলোয়াড় রয়েছেন তবে আমরা আজ প্রথম পর্বে এরকম ৫ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে জানাবো যাদের জন্য ক্রিকেট অনন্য শিখড়ে পৌঁছেছে। চলুন দেখে নেয়া যাক সেই ৫ জন ক্রিকেটারের সম্পর্কে বিস্তারিত:


১. শচীন টেন্ডুলকার ( ভারত ):
তালিকায় যে নামটি সবার আগে আসবে তা হচ্ছে ভারতীয় তারকা ব্যাটসম্যান ক্রিকেটের ঈশ্বর খ্যাত শচীন টেন্ডুলকার। দীর্ঘ ২৪ বছর ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। ১৯৮৯ সালের ১৫ই নভেম্বর করাচিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেষ্ট‌ ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণ হয় শচীন টেন্ডুলকারের। সেই থেকে যে শুরু এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর একাধারে নিজের ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করে গিয়েছেন। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই শচীন খেলেছেন। তবে ওয়ানডে ও টেষ্ট তিনি নিয়মিত খেলেছেন আর তার সমগ্র ক্যারিয়ারে একটিমাত্র টি-টোয়েন্টি খেলেছেন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে সেটি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে ২০০৬ সালে। সেই একটি টি-টোয়েন্টি তার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে একমাত্র টি-টোয়েন্টি। আইপিএল খেললেও জাতীয় দলের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। তবে ওয়ানডে ও টেষ্টে নিজের ব্যাটিং নৈপুণ্য ও স্টাইল দিয়ে ক্রিকেটকে করেছিলেন ধন্য। ওয়ানডে ও টেস্ট মিলিয়ে শচীনের ব্যাটে মোট রান এসেছে ৩৪ হাজার ৩৪৭ রান। আর এই দুই ফরম্যাট মিলিয়ে শচীন মোট ১০০টি সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন। ভারতের হয়ে একটি বিশ্বকাপ জিতেছেন শচীন। শচীন টেন্ডুলকারের মতো খেলোয়াড় যে শুধু ভারতের ক্রিকেটকে ধন্য ও গর্বিত করেছে তা কিন্তু নয়। বরং তার ব্যাটিং নৈপুণ্য পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে আলোকিত করেছে। শচীন ক্রিকেট থেকে চলে গিয়েছেন কিন্তু এখনো চলে যাননি। সকলের মনের ভেতরে ঠিকই এক কোণে রয়ে গিয়েছেন আর সবসময় থাকবেন।


২. স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ( অষ্ট্রেলিয়া )
ক্রিকেট আর ক্রিকেটীয় কিংবদন্তিদের নাম উচ্চারণ করতে গেলে যদি অষ্ট্রেলিয় কিংবদন্তি স্যার ডন ব্রাডম্যানের নাম উচ্চারণ না করা হয় তবে হয়তো এই তালিকাটি সম্পূর্ণ বৃথাই থেকে যাবে। কেননা ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান বলা হয়ে থাকে স্যার ডন ব্রাডমানকে। টেষ্ট ক্রিকেটে ডন ব্র্যাডম্যানের গড় হচ্ছে ৯৯.৯৪। ভাবা যায়?তিনি ১০০ গড় নিয়ে অবসরে যেতে পারতেন কিন্তু পারেননি কারণ শেষ ম্যাচে চার রানের আক্ষেপ। স্যার ডন ব্রাডমানের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মোট রান হচ্ছে ২৮০৬৭ রান। যেখানে তার ১১৭টি শতক রয়েছে। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে ডন ব্রাডমান ব্যর্থ হয়েছিলেন তবে পরবর্তীতে সফল হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার যার ব্যাটে বল সবসময় চুম্বকের মতো লেগে থাকতো। ডন ব্র্যাডম্যানের কীর্তি তাকে সবসময় অমর করে রাখবে। ক্রিকেট যতদিন রবে ততদিন রবে স্যার ডন ব্রাডমানের নাম।


৩. ডব্লিউ জি গ্রেস ( ইংল্যান্ড )
আপনাকে যদি বলা হয় আপনি কি বলতে পারবেন ক্রিকেটের প্রথম মহাতারকা কে? আপনি হয়তো একটু আমতা আমতা করে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান পর্যন্ত আটকে যাবেন যদি না আপনি ক্রিকেটের শেকড় পর্যন্ত না জানেন। কেননা ক্রিকেট এমন একটি খেলা যা জন্ম দিয়েছে অনেক মহাতারকাকে। সাধারণ থেকে বানিয়েছে অসাধারণ। শচীন , লারা, পন্টিং যদি হয়ে থাকে ক্রিকেটের সেরা ছাত্র তবে সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হচ্ছেন ডব্লিউ জি গ্রেস। হ্যা ক্রিকেটের প্রথম মহাতারকা হচ্ছেন ডব্লিউ জি গ্রেস। যে আমলে ক্রিকেটকে তেমন কেউ চিনতো না বা জানতো না‌ তখন শুধু এই মানুষটির জন্য মানুষ এই ক্রিকেট বোঝা থেকে শুরু করে মাঠে খেলা দেখার জন্য ভিড় করতো। তিনি শুধু ক্রিকেটের প্রথম মহাতারকা নন ক্রিকেটের প্রথম পরিচয়দাতাও বটে। তিনি সে আমলে যে রান করেছেন তা হয়তো এখনকার সময়ে অকল্পনীয় মনে হতেই পারে। আচ্ছা তার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মোট রানটা বলি তাহলে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ডব্লিউ জি গ্রেসের মোট রান হচ্ছে ৫৪ হাজার ২১১ রান। তার সেঞ্চুরি ছিলো ১২৪ টি আর হাফ সেঞ্চুরি ছিলো ২৫১টি। বোলিংয়েও ছিলো উইকেটের ফুলঝুরি। তার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মোট উইকেট সংখ্যা ছিলো ২৮০৯টি। তিনি দীর্ঘ ৪৩ বছর একাধারে ক্রিকেট খেলে গিয়েছেন। যে আমলে ক্রিকেটকে শুধু টাইমপাসের খেলা বলে মনে করা হত সে আমলেই তিনি ক্রিকেটকে একটি পেশাদার খেলায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। 


৪. ব্রায়ান লারা ( ওয়েষ্ট ইন্ডিজ )
ক্রিকেটের এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম হচ্ছে ব্রায়ান চার্লস লারা। তিনি ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের এক অমূল্য রতন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি ক্রিকেটের বরপুত্র হিসেবে পরিচিত। লারার নাম আসলে যে ইনিংসটি সবার আগে ভেসে উঠে তা হচ্ছে ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০০ রানের সেই অপরাজিত ইনিংসটি। যেটি এখনো টেষ্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোর। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্রিকেট বিশ্বে শাসন করে গিয়েছেন। ওয়ানডে ও টেস্ট মিলিয়ে ২২ হাজার ৩৫৮ রান করেছেন এই কিংবদন্তি। আর রয়েছে ৫০টির বেশি শতক এবং ১০০টির বেশি অর্ধশত। ক্রিকেটকে অনেক কিছুই দিয়েছেন লারা। ক্রিকেট যেন তার রক্তের সাথে সবসময় মিশে ছিলো। ক্রিকেট ছাড়লেও ক্রিকেট প্রেমীরা সবসময় মনে রেখেছে লারাকে।


৫. অর্জুনা রানাতুঙ্গা ( শ্রীলঙ্কা ):
প্রতিটা ক্রিকেট খেলুড়ে দেশে এমন কিছু হিরো আসে যারা কিনা ক্রিকেটে এসে সে দেশের ক্রিকেটের স্ট্রাকচারকেই বদলে দিয়েছে। তারা যে শুধু নিজেদের উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছেন তা কিন্তু নয় বরং নিজেদের দেশেও নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। সেরকমই হচ্ছেন শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি ক্রিকেটার অর্জুনা রানাতুঙ্গা। রানাতুঙ্গা ছিলেন একজন মাস্টারমাইন্ড। তিনি খুব ভালোভাবে গেইম রিড করতে পারতেন। তার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতার কৃতিত্ব অর্জন করেন। সে আমলে রানাতুঙ্গা ছিলেন দেশের হিরো। তিনি তার অসাধারণ খেলা ও নেতৃত্বগুণ দিয়ে শ্রীলঙ্কার ও ক্রিকেট বিশ্বের সকলের মন জয় করে নিয়েছেন। এখনো সকলে মনে প্রাণে রেখেছে রানাতুঙ্গাকে। 


আশা করি এই পর্বটি আপনাদের ভালো লেগেছে। পরবর্তীতে এই সিরিজটি কনটিনিউ করা হবে। আপনারা পরবর্তী আরো ৫ জন বা ১০ জন ক্রিকেটার নিয়ে এই সিরিজটি করা হবে। এতে করে আপনারা ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেটের লিজেন্ড খেলোয়াড়দের সম্বন্ধে জানতে পারবেন। আপনি যদি ক্রিকেট ভালোবাসেন তবে আপনাকে এই কিংবদন্তি খেলোয়াড়দে সম্বন্ধে জানতে হবে। কেননা তাদের নিয়ে না জানলে আমাদের ক্রিকেট নিয়ে জানাটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। দেখা হবে পরের পর্বে। 

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.